সময়টা নদীর স্রোতের মতো বয়ে গেছে, নিঃশব্দে কিন্তু নিশ্চিত গতিতে। ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো একের পর এক উল্টেছে, আর সেই সাথে বদলে গেছে আমিরের জীবনের ঋতু। ষোলো বছরের সেই কিশোর, যে অন্ধকার বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিষিদ্ধ উত্তেজনায় কাঁপত, সে এখন বাইশ-তেইশ বছরের এক বলিষ্ঠ যুবক। তার চিবুকে এখন নিয়মিত সেভ করার ফলে এক ধরণের কঠোরতা এসেছে, চোখে এসেছে এক স্থির, ভাবলেশহীন দৃষ্টি।
গত কয়েকটা বছর ছিল তার কাছে এক ধরণের তপস্যা, কিংবা বলা ভালো—পালানোর এক নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা। ফাতিমার মৃত্যুর পর সেই পুরনো বাড়িটা যেন একটা বিশাল কবরে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু আমির সেই কবরে নিজেকে পুঁতে ফেলেনি। সে বেছে নিয়েছিল বেঁচে থাকার এক যান্ত্রিক রাস্তা। তার মা নেই, তার রাতের সেই গোপন ‘শো’ নেই, তার শরীরী উত্তেজনার সেই চেনা উৎসটা হারিয়ে গেছে—এই সত্যগুলোকে সে তার মস্তিষ্কের কোনো এক অন্ধকার কুঠুরিতে তালাবন্ধ করে রেখেছিল। চাবিটা সে ছুড়ে ফেলেছিল তার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মোটা মোটা বইয়ের সাগরে।
সে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছিল পড়াশোনায়। ফিজিক্সের জটিল সূত্র, ম্যাথমেটিক্সের দুর্বোধ্য সমীকরণ আর কোডিংয়ের লজিক—এগুলোই হয়ে উঠেছিল তার নতুন নেশা। সে জানত, এই বাড়িতে, এই পুরনো দেওয়ালের মাঝে আটকে থাকলে সে পাগল হয়ে যাবে। ওই বন্ধ দরজাটা, ওই ভাঙা কাঁচের ফুটোটা প্রতিদিন তাকে ডাকত, তাকে মনে করিয়ে দিত তার অতীতের সেই জঘন্য অভ্যাসের কথা। তাই সে পালানোর পথ খুঁজছিল। আর সেই পথ ছিল তার ক্যারিয়ার।
ইমরান আর আমিরের সম্পর্কটা এই কয় বছরে এক অদ্ভুত রূপ নিয়েছে। একই ছাদের নিচে বসবাসকারী দুজন মানুষ, কিন্তু তাদের মধ্যে যেন আলোকবর্ষের দূরত্ব। তাদের সম্পর্কটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল নিতান্তই প্রয়োজনভিত্তিক। সকালে নাস্তার টেবিলে দেখা হওয়া, প্রয়োজনীয় দু-চারটে কথা—”বাজারটা করে এনো”, “বিলটা জমা দিয়েছ?”, “পরীক্ষা কেমন হলো?”—ব্যাস, এটুকুই।
ইমরান তার স্ত্রীর মৃত্যুর পর ভেঙে পড়েননি, আবার নতুন করে বিয়েও করেননি। তিনি তার ব্যবসার কাজে নিজেকে আরও বেশি ব্যস্ত করে তুলেছিলেন। বাড়িতে ফিরতেন দেরি করে, খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়তেন। তার চোখেমুখে কোনো বিষাদ ছিল না, ছিল এক ধরণের কঠিন বাস্তববাদিতা। তিনি মেনে নিয়েছিলেন যে জীবন এভাবেই চলবে। আমিরও মেনে নিয়েছিল। তাদের দুজনের মাঝখানে ফাতিমার স্মৃতি বা সেই গোপন রাতগুলোর কোনো ছায়াই আর পড়ত না। তারা দুজনেই ছিল অদ্ভুতভাবে “ওকে”।
আমির তার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শেষ সেমিস্টারে যখন পৌঁছাল, তখন সে ক্লাসের অন্যতম সেরা ছাত্র। তার ফোকাস ছিল অর্জুনের মতো—পাখির চোখের দিকে। তার বন্ধুরা যখন প্রেম, আড্ডা বা সিনেমা নিয়ে ব্যস্ত থাকত, আমির তখন লাইব্রেরিতে বসে কোডিং প্র্যাকটিস করত। তার কোনো প্রেমিকা নেই, কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু নেই। নারী শরীর বা সম্পর্ক নিয়ে তার কোনো আগ্রহ আছে কি না, তা সে নিজেও জানে না। তার অবচেতন মনে হয়তো এখনো সেই পুরনো ভয় আর ঘৃণার মিশ্রণ রয়ে গেছে, কিন্তু সে সেটাকে পাত্তা দেয় না। সে নিজেকে বুঝিয়েছে, ওসব তার জন্য নয়। তার লক্ষ্য একটাই—প্রতিষ্ঠা এবং এই শহর থেকে মুক্তি।
অবশেষে সেই দিনটা এল। ক্যাম্পাসিংয়ের রেজাল্ট বেরোল।
কলেজের নোটিশ বোর্ডের সামনে যখন ভিড় জমেছে, আমির তখনো শান্ত। সে ভিড় ঠেলে নিজের নামটা খুঁজল। তালিকার একদম উপরের দিকেই জ্বলজ্বল করছে তার নাম। ব্যাঙ্গালোরের এক নামী বহুজাতিক আইটি কোম্পানিতে তার চাকরি হয়েছে। স্যালারি প্যাকেজটা এতই আকর্ষণীয় যে, তার ব্যাচমেটরা ঈর্ষায় তাকাচ্ছিল। কিন্তু আমিরের মনে কোনো উচ্ছ্বাস হলো না। সে কেবল একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এটা শুধু একটা চাকরি নয়, এটা তার এক্সিট টিকিট। কলকাতা, এই পুরনো বাড়ি, আর ওই অভিশপ্ত দরজার আড়াল থেকে পালানোর ছাড়পত্র।
সেদিন বিকেলে বাড়ি ফেরার পথে সে মিষ্টি কিনল না। সে জানে, তার বাড়িতে উৎসবের কোনো চল নেই। সে সোজা বাড়িতে ঢুকল। ড্রয়িংরুমে ইমরান বসে ছিলেন। তার হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ আর চোখের সামনে খবরের কাগজ। গত কয়েক বছর ধরে এই দৃশ্যটা অপরিবর্তিত। সময় যেন এখানে থমকে আছে।
আমির ব্যাগটা সোফায় রাখল। তার বুকের ভেতরটা একটুও কাঁপছে না। সে আজ আর সেই ভীতু কিশোর নয়। সে এখন স্বাবলম্বী হতে যাওয়া এক যুবক। সে ধীর পায়ে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
“আব্বু…” আমিরের গলাটা শান্ত, স্থির।
ইমরান খবরের কাগজটা একটু নামালেন। তার চশমার ফাঁক দিয়ে ছেলের দিকে তাকালেন। তার দৃষ্টিতে কোনো প্রশ্ন নেই, কেবল শোনার অপেক্ষা। “বলো।”
আমির পকেট থেকে অফার লেটারটা বের করল না। সে শুধু মুখে বলল, “আমার চাকরিটা হয়ে গেছে। ব্যাঙ্গালোর থেকে অফার এসেছে। প্যাকেজ খুব ভালো।”
ইমরান কাগজটা পুরোপুরি নামিয়ে রাখলেন। তিনি কিছুক্ষণ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার মুখে কোনো আবেগের ঢেউ খেলল না। না গর্ব, না আনন্দ, না ছেলেকে দূরে পাঠানোর কোনো দুঃখ। তিনি একজন অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীর মতো মাথা নাড়লেন।
“মাশাআল্লাহ্,” ইমরান শান্ত স্বরে বললেন, “খুব ভালো খবর। আল্লাহ কবুল করুন। কবে জয়েন করতে হবে?”
“পরের মাসেই,” আমির উত্তর দিল, “ওরা পনেরো দিনের মধ্যে জয়েনিং করতে বলেছে। আমাকে আগামী সপ্তাহেই রওনা দিতে হবে।”
ঘরের বাতাসে ফ্যানের ঘূর্ণনের শোঁ শোঁ আওয়াজ ছাড়া আর কিছু নেই। এই মুহূর্তে একটা সাধারণ পরিবারে হয়তো আনন্দের বন্যা বয়ে যেত, মা থাকলে হয়তো ছেলেকে জড়িয়ে ধরতেন, বাবা হয়তো গর্বে বুক ফুলিয়ে সবাইকে ফোন করতেন। কিন্তু এখানে সব কিছুই মাপা, সব কিছুই হিসেবি।
ইমরান আবার খবরের কাগজটা হাতে তুলে নিলেন। তার দৃষ্টি আবার খবরের পাতায় নিবদ্ধ হলো। কাগজের আড়াল থেকেই তিনি তার রায় ঘোষণা করলেন, “যাও। অফারটা গ্রহণ করো। এখানে থেকে কী হবে? নতুন জায়গা, নতুন শহর… নিজের মতো করে জীবনটা শুরু করো। ব্যাঙ্গালোরে গ্রোথ ভালো।”
আমির জানত, এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করা ভুল। বাবার এই নির্লিপ্ততা তাকে আঘাত করল না, বরং তাকে আরও নিশ্চিত করল। এই বাড়িতে তাদের দুজনের আর একে অপরের জন্য কিছু দেওয়ার নেই। তাদের সম্পর্কটা একটা এক্সপায়ার করে যাওয়া চুক্তির মতো, যা এখন নবায়ন করার সময় এসেছে—কিন্তু ভিন্ন শর্তে, ভিন্ন জায়গায়।
“জ্বি, আব্বু। আমি তাহলে টিকেট আর থাকার ব্যবস্থাটা করে ফেলি,” আমির বলল।
“করো। কোনো টাকার দরকার হলে বোলো,” ইমরান কাগজ না নামিয়েই বললেন।
আমির আর দাঁড়াল না। সে নিজের ঘরে ফিরে এল। সেই ঘর, যেখানে সে রাতের পর রাত জেগে থাকত। সে তার টেবিলের দিকে তাকাল, যেখানে তার বইগুলো সাজানো। তারপর তার দৃষ্টি গেল সেই দেওয়ালের দিকে—যেখানে সেই পুরনো দরজাটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে। ধুলো আর ঝুল জমে দরজার ফাটলটা এখন প্রায় বোঝাই যায় না। আমির আজ আর সেখানে গিয়ে দাঁড়াল না। তার আর দেখার কোনো আগ্রহ নেই। ওই দরজার ওপাশে এখন আর কিছু নেই, শুধু একাকীত্ব আর শূন্যতা। আর তার এই পাশেও এখন আর কোনো কৌতূহল নেই।
পরের এক সপ্তাহ কাটল ব্যস্ততায়। প্যাকিং, কেনাকাটা, আর ব্যাংকের কাজ। আমিরের মনে হলো সে যেন কোনো জেলখানা থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যাওয়ার দিন সকালে সে বাড়িটার দিকে একবার তাকাল। পুরনো আমলের এই বাড়ি, যার প্রতিটি ইটের খাঁজে লুকিয়ে আছে তার শৈশবের স্মৃতি আর কৈশোরের সেই অন্ধকার অধ্যায়। সে মনে মনে বলল, ‘আমি আর ফিরব না।’
এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন পার হওয়ার সময় তার মনে হলো, সে তার পুরনো চামড়াটা খসিয়ে ফেলছে। প্লেন যখন কলকাতার মাটি ছেড়ে মেঘের ভেলায় ভাসল, তখন আমিরের মনে হলো তার বুকের ওপর থেকে এক বিশাল পাথর নেমে গেছে।
ব্যাঙ্গালোর। ভারতের সিলিকন ভ্যালি। কাঁচ আর কংক্রিটের জঙ্গল, যেখানে রাত কখনো ঘুমায় না। কলকাতা থেকে এই শহরটা সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে গতি আছে, ব্যস্ততা আছে, আর আছে এক ধরণের চকমকে আধুনিকতা যা আমিরের চোখ ধাঁধিয়ে দিল।
কোম্পানি তাকে প্রথম পনেরো দিনের জন্য একটা সার্ভিস অ্যাপার্টমেন্টে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। জায়গাটা শহরের এক পশ এলাকায়—ইলেকট্রনিক সিটি। ঝকঝকে বহুতল ভবন। লিফট দিয়ে উঠে সে যখন তার নির্ধারিত ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়াল, তখন তার হাতে একটা প্লাস্টিকের কি-কার্ড। কোনো মরচে ধরা চাবি নয়, কোনো ক্যাঁচক্যাঁচ করা দরজা নয়।
কার্ড সোয়াইপ করতেই একটা যান্ত্রিক ‘বিপ’ শব্দে দরজাটা খুলে গেল।
ভেতরে পা রাখতেই ঠান্ডা এসি-র বাতাস তাকে স্বাগত জানাল। ফ্ল্যাটটা আধুনিক আসবাবে সাজানো। সাদা মার্বেলের মেঝেতে নিজের প্রতিবিম্ব দেখা যায়। দেওয়ালগুলো ক্রিম কালারের, কোথাও কোনো দাগ নেই, কোনো ফাটল নেই। একটা বড় কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরের শহরটা দেখা যাচ্ছে—অগণিত গাড়ির হেডলাইট আর অফিস বিল্ডিংয়ের আলোয় ঝলমল করছে ব্যাঙ্গালোর।
আমির তার লাগেজটা বেডরুমে নিয়ে গেল। বিছানাটা বিশাল, সাদা ধবধবে চাদরে মোড়া। গদিটা এতই নরম যে বসলে শরীর ডুবে যায়। সে বাথরুমে ঢুকল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখল। এই আমিরকে সে চেনে না। এই আমির স্বাধীন, এই আমির সফল। তার পরনে ব্র্যান্ডের শার্ট, চোখেমুখে ক্লান্তির বদলে আছে এক নতুন শুরুর ঝিলিক।
সে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল। নিচে তাকালে রাস্তাটা অনেক দূর বলে মনে হয়। এখান থেকে কলকাতার সেই পুরনো বাড়িটা কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে। সেই স্যাঁতসেঁতে দেওয়াল, সেই লোবানের গন্ধ, সেই ভাঙা কাঁচের ফুটো, আর সেই অন্ধকার বারান্দা—সব কিছু এখন এক ঝাপসা অতীত।
সে একটা গভীর শ্বাস নিল। এখানকার বাতাসে কোনো পুরনো স্মৃতি নেই, কোনো পাপের গন্ধ নেই। এখানে কেউ তাকে চেনে না। কেউ জানে না ১৬ বছর বয়সে সে কী করত, কী দেখত। সে এখন একজন আইটি প্রফেশনাল, একজন ভদ্রলোক।
আমির রেলিংয়ে হাত রাখল। ঠান্ডা স্টিলের স্পর্শে তার মনে হলো, সে জিতে গেছে। সে তার অতীতকে হারিয়ে দিয়েছে। সে তার আসক্তি, তার অপরাধবোধ—সব কিছুকে ওই পুরনো বাড়িতে তালাবন্ধ করে রেখে এসেছে। এই নতুন শহরে, এই ঝকঝকে জীবনে সে নিরাপদ। সে একা, কিন্তু সে মুক্ত।
ব্যাঙ্গালোর শহরের এক সুউচ্চ আইটি পার্ক। কাঁচের দেওয়াল দিয়ে ঘেরা এই কর্পোরেট জগতটা বাইরের ধুলোবালি আর আবেগ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। তেইশ তলার এক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কিউবিকলে বসে আছে আমির। তার চোখের সামনে দুটো মনিটর, আঙুলগুলো কি-বোর্ডের ওপর ঝড়ের বেগে চলছে। গত দুই বছরে সে নিজেকে এই অফিসের অন্যতম দক্ষ কোডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তার কাজের ধরণ নিখুঁত, সময়ানুবর্তিতা প্রশ্নাতীত।
কিন্তু সহকর্মীদের কাছে আমির এক ধাঁধার নাম। সে সুদর্শন, দীর্ঘদেহী, এবং তার চোখে এমন এক গভীরতা আছে যা সচরাচর এই বয়সের ছেলেদের মধ্যে দেখা যায় না। অফিসের অনেক নারী সহকর্মীই তার প্রতি আগ্রহী, লাঞ্চের সময় বা কফি ব্রেকের ফাঁকে তারা আমিরের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। কিন্তু আমির সব সময় এক অদৃশ্য দেওয়াল তুলে রাখে। সে ভদ্র, কিন্তু ভীষণরকমের মাপা। কোনো মেয়ে তার ডেস্কে এলে সে সৌজন্যের হাসি হাসে, কিন্তু চোখের দিকে তাকায় না। তার দৃষ্টি থাকে হয় কম্পিউটারের স্ক্রিনে, নয়তো হাতের ফাইলের দিকে।
এর পেছনে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণ লুকিয়ে আছে। আমিরের অবচেতন মনে ‘নারী’ মানেই তার মায়ের সেই নিষিদ্ধ রূপ। তার কাছে নারী শরীর মানেই সেই আবছা আলো, সেই ঘামে ভেজা ত্বক, আর সেই আদিম কামনার খেলা। তাই সে ভয় পায়। সে ভয় পায় কোনো মেয়ের দিকে তাকালে যদি তার সেই পুরনো, পশুবৎ সত্তাটা জেগে ওঠে? যদি সে এই সাধারণ মেয়েগুলোর মধ্যেও সেই একই দৃশ্য খুঁজতে শুরু করে? তাই সে নিজেকে গুটিয়ে রাখে কাজের মধ্যে। তার মনে হয়, এই দূরত্বটাই তার রক্ষাকবচ।
এই নিরস, যান্ত্রিক জীবনে হঠাৎ করেই এক বসন্তের বাতাসের মতো প্রবেশ করল সারা।
সারা নতুন জয়েন করেছে প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে। হায়দ্রাবাদি মুসলিম পরিবারের মেয়ে, কিন্তু তার চালচলনে এক আধুনিক আভিজাত্য। সে মাথায় হিজাব পরে, কিন্তু সেটা এতটাই স্টাইলিশ যে তার সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে। সারা প্রাণবন্ত, স্মার্ট এবং ভীষণ আত্মবিশ্বাসী। তার হাসিতে এমন এক সজীবতা আছে যা অফিসের মরা বাতাসকেও যেন চঞ্চল করে তোলে।
সারা প্রথম দিন থেকেই আমিরকে লক্ষ্য করেছিল। অফিসের বাকি ছেলেরা যেখানে তার সাথে কথা বলার বাহানা খোঁজে, সেখানে আমির তাকে দেখেও না দেখার ভান করে। সারার কাছে এটাকে অহংকার মনে হয়নি, মনে হয়েছিল এক গভীর রহস্য। আর রহস্যভেদী মন সব সময়ই নিষিদ্ধের প্রতি আকৃষ্ট হয়।
সেদিন দুপুরের লাঞ্চ ব্রেক। ক্যান্টিনটা সরগরম। আমির বরাবরের মতো এক কোণায় একটা ছোট টেবিলে একা বসে খাচ্ছে। তার কানে হেডফোন, যদিও কোনো গান বাজছে না—এটা কেবল জগত থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার এক উপায়।
হঠাৎ তার সামনের চেয়ারটা টেনে কেউ বসল। আমির চমকে মুখ তুলল। দেখল, সারা তার লাঞ্চবক্স নিয়ে বসেছে, ঠোঁটে এক ঝলমলে হাসি।
“হাই আমির। তুমি কি সব সময় একাই লাঞ্চ করো?” সারার গলার স্বরটা স্পষ্ট, কিন্তু তাতে এক ধরণের আপন করা সুর আছে।
আমির অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে হেডফোনটা নামিয়ে তোতলামি করে বলল, “না, মানে… আসলে একটু কাজ ছিল, তাই…”
সারা হেসে ফেলল। তার হাসির শব্দে আমিরের বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল। “লাঞ্চ ব্রেকের সময় আবার কাজ কিসের মিস্টার ওয়ার্কাহোলিক? খাবারটা অন্তত শান্তিতে খাও। চলো, আজ আমার সাথে বসো। আমি একা খেতে একদম পছন্দ করি না।”
সেই শুরু। আমিরের তৈরি করা অদৃশ্য দেওয়ালটা সারার সহজ, স্বাভাবিক আচরণের সামনে টিকতে পারল না। প্রথমদিকে আমির অস্বস্তি বোধ করত, কিন্তু সারার কথার জাদুতে কখন যেন তার জড়তা কাটতে শুরু করল।
সম্পর্কটা অফিসের ফাইলের ফাঁক গলে বেরিয়ে এল কফি শপের ধোঁয়া ওঠা কাপে। কখনো বা প্রজেক্ট ডেডলাইনের চাপে অফিসেই রাত হয়ে যেত দু-জনের। সেই গভীর রাতে, অফিসের ফাঁকা করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে তাদের মধ্যে কথা হতো। তবে সেই কথাগুলোতে কোনো অশ্লীলতা ছিল না, ছিল জীবন, স্বপ্ন আর ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনা।
আমির অবাক হয়ে আবিষ্কার করল এক নতুন অনুভূতি। সে যখন সারার দিকে তাকায়, তখন তার সেই পুরনো ‘শো’-এর দৃশ্যগুলো মাথায় আসে না। সে সারার শরীরে সেই আদিম ক্ষুধা খোঁজে না। সে লক্ষ্য করে সারার চোখের গভীরতা, সে মুগ্ধ হয় সারার বুদ্ধিমত্তায়। সে লক্ষ্য করে, সারা কথা বলার সময় কীভাবে হাত নাড়ে, কীভাবে হাসলে তার গালে টোল পড়ে।
এই অনুভূতিটা আমিরের কাছে সম্পূর্ণ নতুন। এটা সেই অন্ধকার বারান্দার উত্তেজনা নয়, এটা এক স্নিগ্ধ আলো। সে বুঝতে পারল, সে সারার প্রেমে পড়ছে। এবং সবচেয়ে বড় কথা, এই প্রেমটা ‘পবিত্র’। সে সারাকে দেখে মাস্টারবেট করার কথা কল্পনাও করতে পারে না; বরং তার মনে হয়, সে সারার হাত ধরে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারবে। এই ভাবনাটাই তাকে এক ধরণের মুক্তির স্বাদ দিল। সে ভাবল, হয়তো সে সত্যিই সুস্থ হয়ে গেছে। হয়তো সেই জানোয়ারটা মরে গেছে।
মাস ছয়েক পরের কথা। ব্যাঙ্গালোর শহরের এক রুফটপ রেস্তোরাঁ। মৃদু বাতাস বইছে, নিচে শহরের আলো জোনাকির মতো জ্বলছে। আমির আর সারা ডিনারে এসেছে।
খাওয়া শেষ হয়েছে। আমির একদৃষ্টে সারার দিকে তাকিয়ে ছিল। সারা আজ একটা নীল রঙের সালোয়ার কামিজ পরেছে, যা রাতের আকাশের সাথে মিশে গেছে। আমির অনুভব করল, তার বুকের ভেতরের সব কথা আজ উগড়ে দেওয়া দরকার।
সে টেবিলের ওপর রাখা সারার হাতের ওপর নিজের হাতটা রাখল। সারার হাতটা উষ্ণ, নরম। এই স্পর্শে কোনো পাপ নেই, আছে কেবল নির্ভরতা।
“সারা,” আমিরের গলাটা সামান্য কাঁপল, কিন্তু দৃষ্টি ছিল স্থির, “আমি জানি না আমি তোমাকে কতটা বোঝাতে পারব… কিন্তু গত কয়েকটা মাস আমার জীবনের সেরা সময় ছিল।”
সারাও স্থির দৃষ্টিতে আমিরের দিকে তাকাল। তার চোখের কোণে এক প্রশ্রয়ের হাসি।
“আমি… আমি তোমাকে ভালোবাসি, সারা। পাগলের মতো ভালোবাসি,” আমির এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে ফেলল।
সারা তার হাতটা সরিয়ে নিল না। বরং সে তার অন্য হাতটা দিয়ে আমিরের হাতটা আঁকড়ে ধরল। তার চোখ ভিজে উঠল আবেগে। “আমি জানি, আমির। আমি তোমার ওই চুপচাপ থাকা, তোমার ওই রহস্যময়তা… সব কিছুরই প্রেমে পড়েছি। আমিও তোমাকে ভালোবাসি।”
দুটি হাত একে অপরের সাথে আবদ্ধ হলো। আমিরের মনে হলো, তার জীবনের সমস্ত অন্ধকার ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাচ্ছে। এই ভালোবাসা তাকে নতুন জীবন দিয়েছে।
প্রেম যখন পরিণতি পায়, তখন পরবর্তী ধাপটা অবধারিত হয়ে আসে। আমির আর দেরি করতে চাইল না। সে এখন প্রতিষ্ঠিত, তার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা আছে। সে সিদ্ধান্ত নিল, বাবাকে জানাবে।
সেদিন রাতে সে নিজের ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বাবাকে ফোন করল। ওপ্রান্তে রিং হচ্ছে। আমিরের বুকটা সামান্য ধড়ফড় করছিল, তবে সেটা ভয়ের কারণে নয়, বরং এক নতুন অধ্যায় শুরু করার উত্তেজনায়।
“হ্যালো?” ইমরানের ভারী, যান্ত্রিক গলা ভেসে এল।
“আব্বু, আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন?”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। ভালো আছি। বলো, এত রাতে ফোন?” ইমরানের স্বরে কোনো উদ্বেগ নেই, কেবল জিজ্ঞাসা।
আমির একটা গভীর শ্বাস নিল। “আব্বু, একটা জরুরি কথা ছিল। আমি… আমি একটা মেয়েকে পছন্দ করি। আমরা একে অপরকে ভালোবাসি।”
ফোনের ওপাশে কয়েক মুহূর্তের নীরবতা। আমির শুনতে পেল বাবা খবরের কাগজের পাতা ওল্টাচ্ছেন। ইমরান কি রেগে যাবেন? নাকি অবাক হবেন?
“ওকে,” ইমরানের গলাটা ভাবলেশহীন। “মেয়ের নাম কী? কী করে?”
আমির স্বস্তি পেল। সে দ্রুত বলল, “ওর নাম সারা। আমার সাথেই একই অফিসে কাজ করে, প্রজেক্ট ম্যানেজার। খুব ভালো ফ্যামিলির মেয়ে আব্বু। ওদের বাড়ি হায়দ্রাবাদে।”
“হুম,” ইমরান সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করলেন। “হায়দ্রাবাদ… ভালো। মেয়ে চাকরি করে, সেটাও ভালো। তা তোমরা কি বিয়ের কথা ভেবেছ?”
“জ্বি আব্বু। আমরা বিয়ে করতে চাই। যদি আপনার কোনো আপত্তি না থাকে…”
“আমার আপত্তি থাকার কোনো কারণ নেই,” ইমরান বললেন, যেন তিনি কোনো বিজনেজ ডিল ফাইনাল করছেন। “তুমি যখন পছন্দ করেছ, তখন নিশ্চয়ই ভেবেচিন্তেই করেছ। আর দেরি করে লাভ কী? শুভ কাজ তাড়াতাড়ি হওয়াই ভালো।”
আমির হাসল। বাবার এই নিরাসক্ত ব্যবহার তাকে এখন আর কষ্ট দেয় না। “তাহলে আপনি কবে আসছেন?”
“আমি সামনের মাসেই আসব,” ইমরান জানালেন। “মেয়ের পরিবারের সাথে কথা বলে তারিখটা পাকা করে ফেলা যাক। তুমি ওদের জানিয়ে দিও।”
ফোনটা রাখার পর আমির আকাশের দিকে তাকাল। ব্যাঙ্গালোরের আকাশেও আজ অনেক তারা। তার মনে হলো, জীবনটা এত সুন্দর হতে পারে, তা সে আগে কখনো ভাবেনি। সব কিছু কত সহজে, কত স্বাভাবিক গতিতে এগোচ্ছে। তার একটা ভালো চাকরি আছে, একটা সুন্দর ফ্ল্যাট আছে, আর এখন তার জীবনে আসছে সারা—তার ভালোবাসার মানুষ।
সে এক নতুন, সুস্থ জীবন শুরু করতে চলেছে। তার অতীত, সেই বন্ধ দরজার ওপাশের অন্ধকার জগত, সেই অসুস্থ অভ্যাস—সব কিছু যেন বহু আলোকবর্ষ দূরে সরে গেছে। সে ভাবল, ‘আমি জিতে গেছি। আমি স্বাভাবিক হয়ে গেছি।’
কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম বড় বিচিত্র। সে যখনই মানুষকে তার বিজয়ের চূড়ায় নিয়ে যায়, তখনই পতনের রাস্তাটা প্রস্তুত করতে শুরু করে। আমির জানত না, তার শরীরে একটা বড় ত্রুটি লুকিয়ে আছে। সে জানত না, তার এই ‘স্বাভাবিক’ দাম্পত্য জীবনের স্বপ্নে এক বিশাল আঘাত আসতে চলেছে, যা তাকে আবার টেনে নিয়ে যাবে সেই অতীতে, সেই বিকৃত কামনার গোলকধাঁধায়। সে শুধু জানত, সে সুখী। আর এই সুখের আড়ালেই অপেক্ষা করছিল নিয়তির এক নিষ্ঠুর পরিহাস।
ব্যাঙ্গালোরের এক অভিজাত এলাকা, কোরামঙ্গলা। সন্ধ্যা নেমেছে, শহরের রাস্তায় হেডলাইটের নদী বয়ে যাচ্ছে। অফিস ছুটির পর এই সময়টায় ক্যাফেগুলোতে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। তেমনই এক ঝাঁ চকচকে কফি শপের কোণায় কাঁচের দেওয়াল ঘেঁষে বসে আছে আমির আর সারা।
ভেতরে কফি বিনের কড়া গন্ধ আর এসপ্রেসো মেশিনের হিসহিস শব্দ। ল্যাপটপ খুলে বসে থাকা একঝাঁক তরুণ-তরুণীর ভিড়ে তাদের টেবিলটা যেন এক আলাদা দ্বীপ। আমিরের সামনে একটা ব্ল্যাক কফি, ধোঁয়া ওড়া বন্ধ হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ উল্টোদিকে বসা সারার ওপর।
সারা আজ একটা হালকা পিচ রঙের কুর্তা পরেছে, মাথায় ম্যাচিং হিজাবটা খুব পরিপাটি করে বাঁধা। কিন্তু তার স্বভাবসুলভ চঞ্চলতা আজ নেই। সে বারবার তার ফোনটার স্ক্রিন অন করছে আবার অফ করছে। তার ভুরুতে চিন্তার ভাঁজ, ঠোঁট দুটো চেপে আছে।
আমির লক্ষ্য করল, সারার আঙুলগুলো টেবিলের ওপর অস্থিরভাবে টোকা দিচ্ছে। গত ছয় মাসে সে সারাকে চিনেছে। এই মেয়েটি অফিসের জটিল সব প্রজেক্ট একাই সামলায়, ক্লায়েন্ট মিটিংয়ে ঝড় তোলে। তাকে এভাবে নার্ভাস হতে দেখা আমিরের কাছে নতুন।
“কী হলো?” আমির শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল, “টেনশন করছ কেন? কফিটা তো জুড়িয়ে গেল।”
সারা চমকে মুখ তুলল। তার চোখে একটা অস্বস্তি, আবার একই সাথে একটা দৃঢ়তার ছাপ। সে ফোনটা টেবিলের ওপর উপুড় করে রাখল। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “আজ আম্মিকে ফোন করেছিলাম… লাঞ্চ টাইমে।”
আমির সোজা হয়ে বসল। সে জানে আজকের ফোনকলটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তারা এই দিনটার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। “সবটা বলেছ?”
“হ্যাঁ, সবটা,” সারা মাথা নাড়ল। “তোমার কথা, তোমার চাকরির কথা, আমরা যে… মানে আমাদের সম্পর্কের কথা।”
আমির অপেক্ষা করল। তার বুকের ভেতরটা হালকা দুলছে। তার অতীত, তার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড—এসব নিয়ে সে খুব একটা ভাবছে না। তার ভয় অন্য জায়গায়। সে কি একটা স্বাভাবিক সম্পর্কের যোগ্য? এই প্রশ্নটা অবচেতন মনে তাকে এখনো খোঁচায়।
“কী বললেন উনি?” আমির জানতে চাইল।
সারা এবার একটু হাসল, তবে সেই হাসিতে কিছুটা ক্লান্তি আর কিছুটা কৌতুক মিশে আছে। সে বলল, “আম্মি তো প্রথমে চুপ করে শুনলেন। আমি যখন বললাম তুমি আইটিতে আছো, ভালো প্যাকেজ, তখন একটু আশ্বস্ত হলেন। কিন্তু তারপরই সেই টিপিক্যাল প্রশ্নটা করলেন।”
“কী প্রশ্ন?”
“বললেন, ‘ছেলেটা কী করে, কত বেতন পায় সেটা তো বললি। কিন্তু ও কি নামাজ পড়ে? দ্বীনদার তো?'” সারা একটু থামল। তার পরিবার উত্তর প্রদেশের এক রক্ষণশীল পরিমণ্ডলে থাকে। সেখানে মডার্ন লাইফস্টাইল আর ধর্মীয় অনুশাসনের এক অদ্ভুত মিশ্রণ আছে। পাত্রের যোগ্যতা বিচার করতে গেলে সেখানে বেতনের স্লিপের সঙ্গে তার ঈমানী জোরটাও মেপে দেখা হয়।
আমির চুপ করে রইল। সে নামাজ পড়ে, রোজা রাখে—এগুলো তার অভ্যাসের অংশ। কিন্তু তার ইবাদতের পেছনে যতটা না ভক্তি থাকে, তার চেয়ে বেশি থাকে এক ধরণের ভয়। পাপ মোচনের চেষ্টা। সে জানে না, সে নিজেকে ‘দ্বীনদার’ বলতে পারবে কি না।
“তুমি কী বললে?” আমিরের গলাটা একটু খসখসে শোনাল।
সারা আমিরের হাতের ওপর নিজের হাতটা রাখল। তার স্পর্শে এক অদ্ভুত সাহস। সে বলল, “আমি সোজা বলে দিয়েছি। বললাম, ‘আম্মি, ও কাজ করে, ও সৎ, আর ও আমাকে সম্মান করে। আপনার জামাই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে কি না সেটা দিয়ে আমার সংসার চলবে না। আপনাকে আমার জামাইয়ের নামাজ নয়, আমার সুখটা দেখতে হবে। আমি ওর সাথে ভালো থাকব, এটাই কি যথেষ্ট নয়?'”
আমির অবাক হয়ে সারার দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার মেরুদণ্ড শক্ত। সে তার পরিবারের রক্ষণশীলতার সামনে দাঁড়িয়ে আমিরের পক্ষ নিয়েছে, তাও ধর্মকে পাশ কাটিয়ে সুখকে প্রাধান্য দিয়ে।
“আম্মি কী বললেন তারপর?”
“আর কী বলবেন?” সারা হাসল, এবার অনেকটা নিশ্চিন্তের হাসি। “আমার গলা শুনে বুঝে গেছেন আমি ডিসিশন নিয়ে ফেলেছি। বললেন, ‘তোর আব্বুকে বলব। তুই যখন পছন্দ করেছিস, তখন নিশ্চয়ই খারাপ হবে না। তবে ওরা যেন জলদি যোগাযোগ করে।'”
আমির একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কফি শপের এই যান্ত্রিক কোলাহলের মাঝে তার মনে হলো, সে একটা বড় হার্ডল পার করে ফেলেছে। তার অতীত, তার অন্ধকার স্মৃতি—সব কিছুকে তুচ্ছ করে বর্তমানে এই মেয়েটি তাকে গ্রহণ করেছে।
“আমি আজই আব্বুকে জানাব,” আমির বলল, তার গলায় এখন নতুন প্রত্যয়। “এই উইকেন্ডেই আব্বু কথা বলবেন তোমার বাবার সাথে।”
সেই সপ্তাহান্তে ব্যাঙ্গালোরের ফ্ল্যাটে আমির একা। শনিবারের বিকেল। ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে পড়ন্ত বেলার রোদ এসে পড়েছে সোফায়। আমির ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল, যদিও সে খুব একটা খায় না। আজ সে একটু অস্থির।
সে তার বাবাকে সবটা জানিয়েছে। ইমরান, বরাবরের মতোই, কোনো ভাবাবেগ দেখাননি। তিনি শুধু সারার বাবার ফোন নম্বরটা চেয়ে নিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “আমি কথা বলে নেব। তুমি চিন্তা করো না।”
ইমরান এখন কলকাতায়। সেই পুরনো বাড়িতে। আমির কল্পনা করার চেষ্টা করল, বাবা এখন কোথায় বসে আছেন? ড্রয়িংরুমে? নাকি সেই বেডরুমে? এই চিন্তাটা মাথায় আসতেই সে মাথা ঝেঁকে ফেলল। না, ওসব আর ভাববে না সে।
সন্ধ্যা সাতটা। আমিরের ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে নাম ভাসছে—‘আব্বু’।
আমির দ্রুত রিসিভ করল। “জ্বি, আব্বু?”
“আমি সারার বাবার সাথে কথা বলেছি,” ইমরানের গলাটা ভাবলেশহীন, যেন তিনি অফিসের কোনো ক্লায়েন্টকে আপডেট দিচ্ছেন।
“কী… কী বললেন উনি?” আমির অধীর আগ্রহে জিজ্ঞেস করল।
ইমরান ফোনে কাউকে লাইনে নিলেন, অথবা হয়তো আগেই কথা বলে এখন আমিরকে কনফারেন্সে বা স্পিকারে শোনালেন না, তিনি সরাসরি সারসংক্ষেপটা দিলেন। কিন্তু আমিরের অনুরোধে তিনি কথোপকথনটা হুবহু শোনালেন, যা তিনি রেকর্ড করেছিলেন বা এখন আবার লাইনটা জোড়া লাগালেন যাতে আমির শুনতে পায়।
দৃশ্যটা কলকাতায়। ইমরান তার ল্যান্ডলাইন বা মোবাইল থেকে ডায়াল করেছেন হায়দ্রাবাদে।
ইমরান: “আসসালামু আলাইকুম। আমি আমির-এর আব্বা, ইমরান বলছি।” তার গলা ভারী, দরাজ এবং আত্মবিশ্বাসী। একজন সফল ব্যবসায়ী যেমনটা কথা বলেন।
সারার বাবা (ওপাশ থেকে): “ওয়ালাইকুম আসসালাম, ভাই সাহেব। চিনতে পেরেছি। সারা আমাকে সব বলেছে। কেমন আছেন আপনারা?” ভদ্রলোক বেশ মার্জিত, হায়দ্রাবাদি উর্দু টান আছে কথায়।
ইমরান: “আলহামদুলিল্লাহ, ভালো। দেখুন ভাই সাহেব, আমি কথা পেঁচাতে পছন্দ করি না। আমার ছেলে আমাকে সব জানিয়েছে। ও আপনার মেয়েকে পছন্দ করে, আর আপনার মেয়েও নাকি রাজী। ছেলেমেয়েরা যখন রাজী, তখন আমাদের আর মাঝখানে কী বলার আছে?”
সারার বাবা: “একদম ঠিক বলেছেন। আমরাও তো চাই মেয়ের সুখ। আমির মাশাআল্লাহ প্রতিষ্ঠিত ছেলে, ভালো কোম্পানিতে আছে। আমাদের দিক থেকে কোনো আপত্তি নেই।”
ইমরান: “শুকরিয়া। আমার ছেলেটা একা থাকে ব্যাঙ্গালোরে। ওর মা নেই, আপনারা তো জানেন। আমি চাই না ও আর বেশিদিন একা থাকুক। আমার তো মনে হয়, শুভ কাজে দেরি করা ঠিক না। নিকাহ্ (বিয়ে)-টা তাড়াতাড়ি সেরে ফেলাই ভালো। কী বলেন?”
সারার বাবা: “তা তো বটেই। তবে একটু প্রস্তুতির ব্যাপার আছে…”
ইমরান: “দেখুন, এখনকার ছেলেমেয়ে, ওরা জাঁকজমক চায় না। তাছাড়া আমরা কলকাতাতেও অনুষ্ঠান করব না, আপনারা হায়দ্রাবাদেও করবেন না। মাঝখানের জায়গা ব্যাঙ্গালোর, ওরা ওখানেই আছে। ওখানেই একটা ছোট করে গেট-টুগেদার করে নিকাহ্ পড়িয়ে দেওয়া যাক। কাজ-কর্মের ছেলেমেয়ে, ওদের ছুটিছাটার সমস্যা থাকে। অহেতুক দেরি করে লাভ কী?”
সারার বাবা একটু ইতস্তত করলেন, হয়তো তিনি ধুমধাম করে মেয়ের বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইমরানের যুক্তির কাছে হার মানলেন। “বেশ, আপনি যখন বলছেন। তাহলে কবে নাগাদ ভাবছেন?”
ইমরান: “সামনের মাসেই তো ভালো দিন আছে। আমি ক্যালেন্ডার দেখছিলাম। ঠিক চার মাস পর, মানে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। হাতে যথেষ্ট সময় আছে প্রস্তুতির জন্য। এর মধ্যে আমি একবার ব্যাঙ্গালোর যাব, আপনিও আসুন। সামনাসামনি কথা বলে সব ফাইনাল করব।”
সারার বাবা: “ঠিক আছে ভাই সাহেব। ইনশাআল্লাহ, তাই হবে। আল্লাহ জুড়ি মিলিয়ে রেখেছেন, আমরা তো শুধু উছিলা।”
ইমরান: “আল্লাহ হাফেজ।”
ফোনটা কেটে গেল। ইমরান আমিরকে বললেন, “শুনলে তো? সব ঠিক করে ফেললাম। চার মাস পর বিয়ে। এর মধ্যে তুমি একটা ভালো ফ্ল্যাট দেখো, যেটা ফ্যামিলি নিয়ে থাকার মতো। আর ছুটির ব্যবস্থা করে রেখো।”
“জ্বি আব্বু, ধন্যবাদ,” আমিরের গলাটা ধরে এল। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না সব কিছু এত সহজে হয়ে যাচ্ছে।
“ধন্যবাদের কিছু নেই। এটা আমার দায়িত্ব,” ইমরান বললেন। “আর হ্যাঁ, নিজেকে প্রস্তুত করো। সংসার করা সহজ কাজ নয়। আল্লাহ হাফেজ।”
লাইনটা কেটে গেল। আমির ফোনটা হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চার মাস। আর মাত্র চার মাস পর তার জীবনটা সম্পূর্ণ বদলে যাবে। সে আর একা থাকবে না। তার বিছানায়, তার পাশে, একজন রক্ত-মাংসের মানুষ থাকবে। সারা থাকবে।
এই ভাবনাটা তাকে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ দিল। কিন্তু সেই রোমাঞ্চের তলায়, মনের খুব গভীরে, একটা সূক্ষ্ম ভয়ের স্রোত বয়ে গেল। তার নতুন জীবন শুরু হতে যাচ্ছে, সব কিছু নিখুঁত। কিন্তু সে কি সত্যিই তার অতীতকে পুরোপুরি মুছতে পেরেছে? নাকি সেই পুরনো বাড়ির ছায়া, সেই ভাঙা কাঁচের ফুটোর স্মৃতি, কোনো না কোনোভাবে তার এই নতুন, ঝকঝকে দাম্পত্য জীবনে ফিরে আসবে?
আমির মাথা ঝেঁকে ফেলল। সে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে শহরের আলোর দিকে তাকাল। সে নিজেকে কথা দিল, সে ভালো স্বামী হবে। সে তার বাবার মতো হবে না, আবার তার বাবার মতো গোপন কামনার শিকারও হবে না। সে হবে স্বাভাবিক, সুস্থ।
কিন্তু সে জানত না, তার শরীর তার সাথে এক বড় বিশ্বাসঘাতকতা করতে প্রস্তুত হয়ে আছে। আর সেই বিশ্বাসঘাতকতাই তাকে আবার টেনে নিয়ে যাবে তার বাবার কাছে—ভিন্ন এক প্রয়োজনে, ভিন্ন এক সমীকরণে।
আজ সারা এসেছে। এর আগেও সে এসেছে, কিন্তু তখন সে ছিল কেবলই সহকর্মী বা প্রেমিকা, যার আসার মধ্যে একটা সংকোচ ছিল, একটা সময়ের সীমাবদ্ধতা ছিল। কিন্তু আজ সে এসেছে ‘হবু স্ত্রী’র অধিকারে। তাদের বিয়ের তারিখ পাকা, দুই পরিবারের সম্মতি আছে। এই সামাজিক সিলমোহরটা তাদের সম্পর্কের মাঝখানের শেষ অদৃশ্য দেওয়ালটাও ভেঙে দিয়েছে।
সারা রান্নাঘরে কফি বানাচ্ছে। কফি মেকারের শোঁ শোঁ আওয়াজ আর কফির মেঠো গন্ধ মিলেমিশে ফ্ল্যাটটাকে একটা ‘সংসার’র রূপ দিয়েছে। আমির ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে ল্যাপটপে কিছু একটা দেখছিল, কিন্তু তার মন পড়ে আছে রান্নাঘরে। সে উঠে গিয়ে দরজার ফ্রেমে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। সারাকে দেখল। ঘরোয়া পোশাকে, চুলগুলো একটু এলোমেলো করে খোঁপা করা, গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে কফি মগে ঢালছে সে। এই দৃশ্যটা আমিরের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দিল। তার মনে হলো, এই তো জীবন। এটাই তো স্বাভাবিকতা। তার ছোটবেলার সেই দেখা দৃশ্যগুলোর সাথে এর কোনো মিল নেই। এখানে কোনো লুকোচুরি নেই, কোনো পাপ নেই।
“কী দেখছ অত?” সারা মগ দুটো হাতে নিয়ে ঘুরতেই আমিরকে দেখে হেসে ফেলল।
“তোমাকে,” আমির সহজ গলায় বলল। “তোমাকে এই ফ্ল্যাটে, এই রান্নাঘরে… খুব আপন মনে হচ্ছে।”
সারা একটু লজ্জা পেল। তার গালে হালকা রঙের ছোঁয়া লাগল। সে এগিয়ে এসে একটা মগ আমিরের হাতে দিল। “চলো, বারান্দায় যাই। আজকের আবহাওয়াটা খুব সুন্দর।”
বারান্দায় কফি ও চাপা উত্তেজনা:
তারা দুজন বারান্দায় এসে দাঁড়াল। নিচে শহরের ব্যস্ততা, গাড়ির হেডলাইটের স্রোত, আর উপরে মেঘলা আকাশ। কিন্তু তাদের দুজনের জগতটা এখন এই কয়েক স্কোয়ার ফুটের বারান্দায় সীমাবদ্ধ।
তারা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছে। মাঝে মাঝে কনুইয়ে কনুই ঠেকে যাচ্ছে। এই সামান্য স্পর্শেই দুজনের শরীরে বিদ্যুতের ঝিলিক খেলে যাচ্ছে। তারা কথা বলছে বিয়ে নিয়ে, নতুন ফ্ল্যাট সাজানো নিয়ে, হানিমুনে কোথায় যাবে তা নিয়ে। কিন্তু প্রতিটি কথার নিচেই বয়ে চলেছে এক তীব্র, অব্যক্ত কামনার স্রোত। তারা দুজনেই জানে, আজকের সন্ধ্যাটা অন্যরকম। আজ তাদের থামানোর কেউ নেই।
আমির কফির মগটা রেলিংয়ের ওপর রাখল। সে ঘুরে সারার মুখোমুখি দাঁড়াল। সারাও তার মগটা নামিয়ে রাখল। তার হৃৎস্পন্দন দ্রুত হচ্ছে, সে বুঝতে পারছে আমিরের চোখের ভাষা।
“সারা…” আমিরের গলার স্বরটা একটু গাঢ়।
“বলো…” সারা নিচু গলায় উত্তর দিল, তার দৃষ্টি আমিরের ঠোঁটের দিকে।
আমির আলতো করে সারার হাতটা ধরল। তারপর ধীরে ধীরে তাকে নিজের কাছে টেনে নিল। সারা বাধা দিল না, বরং সে আমিরের বুকের ওপর তার মাথাটা রাখল। আমিরের হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি সে শুনতে পাচ্ছে।
“আমি তোমাকে ভালোবাসি,” আমির ফিসফিস করে বলল।
সারা মুখ তুলে তাকাল। তার চোখে জলল এক অদ্ভুত দ্যুতি। “আমিও।”
দৃশ্য: বেডরুমে প্রবেশ:
আমির আর কোনো কথা বলল না। সে শুধু সারার হাতটা শক্ত করে ধরল। তারপর আলতো টানে তাকে ইঙ্গিত করল ভেতরে আসার। সারা একবারও পিছিয়ে গেল না। সে আমিরের সাথে পা মেলাল। তারা ড্রয়িংরুম পেরিয়ে, করিডোর ধরে বেডরুমে প্রবেশ করল।
বেডরুমের আলোটা নেভানো ছিল। আমির সুইচ টিপে কেবল বেডসাইড ল্যাম্পটা জ্বালল। সেই ম্লান, সোনালী আলোয় ঘরটা এক মায়াবী রূপ নিল। বাইরের পৃথিবীর কোলাহল এখানে পৌঁছাচ্ছে না। এসি-র মৃদু যান্ত্রিক শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই।
মূল পর্ব (The “Normal” Sex Scene):
আমির আর সারা বিছানার পাশে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। এই মুহূর্তটা আমিরের জন্য এক বিশাল পরীক্ষার মতো। তার মস্তিষ্কের কোনো এক কোণায় হয়তো সেই পুরনো স্মৃতিরা উঁকি দিতে চাইছে, কিন্তু সে আজ তাদের পাত্তা দেবে না। আজ সে তার বাবাকে নকল করবে না, আজ সে তার নিজের মতো করে ভালোবাসবে।
তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। আমিরের ঠোঁট নেমে এল সারার ঠোঁটের ওপর। এটা কোনো ক্ষুধার্ত, আগ্রাসী চুম্বন ছিল না। এটা ছিল গভীর, ধীর এবং ভালোবাসায় পূর্ণ এক চুম্বন। তারা একে অপরের স্বাদ নিচ্ছিল, একে অপরের অস্তিত্বকে অনুভব করছিল।
চুমু খেতে খেতেই আমিরের হাত চলে গেল সারার কুর্তায়। সারা একটুও আড়ষ্ট হলো না। সে হাত তুলে আমিরের চুলের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে দিল। আমির ধীরে ধীরে সারার কুর্তাটা শরীর থেকে আলাদা করে দিল। তারপর ওড়নাটা। সারা এখন কেবল তার সালোয়ার আর অন্তর্বাসে। আমিরের চোখে কোনো লোলুপতা নেই, আছে কেবল মুগ্ধতা। সে দেখল তার হবু স্ত্রীকে—সে তার মায়ের মতো নয়, সে অন্যরকম। সে তার নিজের।
সারা এবার লাজুক হাতে আমিরের শার্টের বোতামগুলো খুলতে শুরু করল। তার আঙুলগুলো সামান্য কাঁপছিল। বোতামগুলো খুলে সে আমিরের বুকে হাত রাখল। আমিরের শরীরের উষ্ণতা তার হাতে ছড়িয়ে পড়ল। কোনো তাড়াহুড়ো নেই, নেই কোনো বন্যতা। তারা একে অপরের শরীরকে চিনছে, জানছে। এটা এক সহজ, সুন্দর প্রক্রিয়া।
শারীরিক বিন্যাস ও ভঙ্গি:
তারা বিছানায় শুয়ে পড়ল। ধবধবে সাদা চাদরের ওপর সারার শরীরটা যেন ফুলের পাপড়ির মতো লাগছে। আমির তার ওপর ঝুঁকে এল। মিশনারি পজিশন। এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক, সবচেয়ে সংযোগপূর্ণ ভঙ্গি। আমির তার দুই হাতের ওপর ভর দিয়ে সারার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সারা তার দুই হাত দিয়ে আমিরের গলা জড়িয়ে ধরল।
আমির নিচু হয়ে সারার গলায়, কাঁধে চুমু খেল। সারা শিউরে উঠল, তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল এক মিষ্টি, নরম আওয়াজ। এই আওয়াজ আমিরের চেনা সেই “ক্যাঁচক্যাঁচ” বা “গোঙানি”-র মতো নয়। এটা ভালোবাসার শব্দ।
মূল মুহূর্ত (The Unprotected Act):
ধীরে ধীরে, উত্তেজনার পারদ চড়তে লাগল। আমির তার প্যান্টটা খুলে ফেলল। তার পৌরুষ এখন জাগ্রত, প্রস্তুত। সে যখন সারার দুই পায়ের মাঝখানে জায়গা করে নিল, ঠিক তখনই সারা আলতো করে আমিরের হাতটা ধরল।
ঘরটা নিস্তব্ধ। তাদের দুজনের ঘন শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
সারা আমিরের চোখের দিকে তাকাল। তার গলায় কোনো ভয় নেই, কেবল একটা ব্যবহারিক প্রশ্ন।
“আমির…” সারা শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “তোমার কাছে… কিছু আছে?”
আমির এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে বুঝতে পারল সারা কীসের কথা বলছে। প্রোটেকশন। কনডম। আমিরের কাছে ওসব নেই। সে কখনো ওসব রাখেনি, কারণ তার জীবনে এর আগে কোনো নারীর সাথে শোয়ার প্রয়োজনই পড়েনি।
আমির মাথা নেড়ে বলল, “না। আমি… মানে আমার কাছে এসব নেই। আমি এসব রাখি না।”
সারা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। সে হয়তো ভাবল, তাদের বিয়ে তো ঠিক হয়েই গেছে। আর মাত্র কয়েকটা মাস। তাছাড়া, এই মুহূর্তটা নষ্ট করার মতো মানসিকতা তার ছিল না। সে আমিরের চোখে এক ধরণের অসহায়তা আর সততা দেখল।
“ঠিক আছে,” সারা মৃদু হাসল। সে আমিরের হাতটা নিজের বুক থেকে সরিয়ে নিচে নামাল, তারপর তার কোমরে জড়িয়ে ধরল। সে নিজেকে একটু উপরে তুলে ধরল, আমিরকে আমন্ত্রণ জানাল। “এসো… ভেতরে এসো।”
আমিরের হৃৎপিণ্ডটা জোরে চলছে। সে ধীরে ধীরে নিজেকে সারার শরীরের সাথে অ্যাডজাস্ট করে নিল। তারপর খুব সাবধানে, খুব আলতো করে তার বাঁড়াটা সারার গুদের মুখে স্থাপন করল।

সারার শরীরটা একটু শক্ত হয়ে গেল, হয়তো প্রথমবার বলে। আমির তাকে সময় দিল। সে সারার কপালে চুমু খেল, তাকে আশ্বস্ত করল। তারপর একটু একটু করে চাপ দিল।
ধীরে ধীরে, কোনো বাধা ছাড়াই, আমিরের লিঙ্গ সারার উষ্ণ, পিচ্ছিল গুদের ভেতরে প্রবেশ করতে শুরু করল। আমিরের মনে হলো সে কোনো এক শান্তির সাগরে ডুবে যাচ্ছে। তার শরীরের প্রতিটি কোষে এক অনাবিল সুখের অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। এটা তার জীবনের প্রথম সেক্স। কোনো বিকৃতি নেই, কোনো লুকোচুরি নেই।
পুরোটা ভেতরে ঢোকার পর তারা দুজনেই কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। আমির সারার শরীরের ভেতর নিজেকে অনুভব করল। সারা আমিরের পিঠ আঁকড়ে ধরে ঘন ঘন শ্বাস নিতে লাগল।
তারপর শুরু হলো সেই শাশ্বত ছন্দ। আমির ধীরে ধীরে নড়াচড়া শুরু করল। বাইরে তখনো বৃষ্টির ফোঁটা জানলায় টোক্কা দিচ্ছে, আর ভেতরে দুটি শরীর এক হয়ে ভালোবাসার উদযাপন করছে। আমির খুব বেশি জোরে নয়, আবার খুব আস্তেও নয়—একদম স্বাভাবিক ছন্দে মিলন চালিয়ে গেল। তার মনে হলো, সে সম্পূর্ণ।
কয়েক মিনিট ধরে এই আদান-প্রদান চলল। আমিরের উত্তেজনা যখন চরমে পৌঁছাল, সে থামল না। সারার সম্মতি তার কানে বাজছে—”ভেতরের এসো”। সেই বিশ্বাস আর ভালোবাসার ওপর ভর করে, আমির তার শরীরের সমস্ত নির্যাস, তার সমস্ত সুখ সারার গুদের একদম গভীরে ঢেলে দিল। সে অনুভব করল তার বীর্য ছিটকে বেরিয়ে গিয়ে সারার জরায়ুর দিকে ধাবিত হচ্ছে।
আমির ক্লান্ত হয়ে সারার ওপর এলিয়ে পড়ল, কিন্তু তার ভার যাতে সারার কষ্ট না দেয় সেদিকে খেয়াল রাখল। সারা তাকে জড়িয়ে ধরে রাখল, আমিরের চুলে বিলি কেটে দিতে লাগল।
তারা দুজনেই হাঁপাচ্ছে। তাদের শরীর ঘামে ভিজে গেছে, কিন্তু সেই ঘামে কোনো অস্বস্তি নেই। আছে এক পূর্ণতার ঘ্রাণ। আমির মুখটা সারার গলার কাছে গুঁজে দিয়ে শুয়ে রইল। তার মনে হলো, সে তার বাবাকে ভুল প্রমাণ করেছে, সে তার অতীতকে ভুল প্রমাণ করেছে। সে স্বাভাবিক। সে সুখী।
